Categories
আইন শৃঙ্খলা গুরত্বপুরন ব্যাক্তিত্ব সামাজিক অবস্থা

পারভেজ, ভাই আমার! ভাল থাকিস তুই!

মাত্র বাইশ বছর বয়েস ছিল ছেলেটার, পুলিশের কন্সটেবলের চাকুরি করত। দিনে ষোল থেকে আঠারো ঘন্টা ডিউটি, ছুটি নেই। মাথার উপরে সিনিয়র অফিসারের বকাঝকা, আর নীচে পাবলিকের গালি। এর মধ্যেই কেটে যাচ্ছিল জীবন।

গালি দেবার বেলায় বাঙালি বড়ই স্মার্ট, ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে সুযোগ পেলে বারাক ওবামার মায়ের সাথেও শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে এক মুহূর্ত দেরি করেনা -আর পুলিশ তো কোন ছার! দুষ্ট বদমায়েশ নেই হেন কোন জায়গা এদেশে নেই, তবে বিচিত্র কারণে সবাই মনে করে- একমাত্র পুলিশ ছাড়া এদেশের বাকি সবাই স্বয়ং ভগবান প্রেরিত দেবদূতবিশেষ!

এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিন। গরীব দেশ, এক হাজার জনের জন্য পুলিশ কতজন তা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খোঁজা লাগে। দুর্নীতি, নোংরামির দুষ্টচক্র তো আছেই! সরকারের বরাদ্দ অতি সামান্য, মাথাপিছু দৈনিক ত্রিশ পয়সার কাছাকাছি ট্যাক্স দেয় জনগণ- আর আশা করে ওতেই দেশের পুলিশ এনওয়াইপিডি এর চেয়েও আধুনিক হবে।

Badge_of_BP

ছেলেটার ছোট্ট মাথায় এতসব খেলে না, ও শুধু জানে- পুলিশের চাকুরি মানে চোর ডাকাতের হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো। ওটা করতে গেলে প্রাণ যায় যাক, তাও মান বাঁচুক!

বৃহষ্পতিবার কক্সবাজারের লাবনী পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ছিল ও। না, ডিউটি শুরু হয়নি তখনও- এমনিই এসেছে সাদা পোশাকে, অস্ত্রও আনেনি সাথে। পুলিশ হলে বুঝি সাগরের ঢেউ দেখতে ইচ্ছে করেনা?!

হঠাৎ চোখে পড়ল একটা দৃশ্য- আরে! কি হচ্ছে ওখানে? দেখে তো মনে হচ্ছে ছিনতাই!

সাথে অস্ত্র নেই, পরা নেই ইউনিফর্মও। যেহেতু এটা ডিউটির সময় না, মুখ ফিরিয়ে চলে গেলেও কারও কিছু বলার নেই। চলেও যেত ও, এরকম ছিনতাই কতই না হয়!

কিন্তু না! পাসিং আউট প্যারেডে কুরআন শরীফ সামনে রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিল সবাই- নিজের প্রাণ বিপন্ন করে হলেও মানুষের জানমালের হেফাজত করবে। নাই বা থাকল হাতিয়ার, নাই বা হল ডিউটির সময়, পালিয়ে গেলে আয়নায় মুখ দেখাবে কিকরে!

আঠারো বছর বয়েসে পুলিশে ঢুকেছে ও, ফোর্স ওকে আর ওর পরিবারকে এতদিন রেশন খাইয়েছে। উর্দি পরণে না থাকুক, উর্দির ফরজ নেভানোর এই তো সময়!

রণহুংকার ছেড়ে খালি হাতে এগিয়ে গেল ও, একাই জাপটে ধরল অস্ত্রধারী তিন তিনজন ছিনতাইকারীকে।

সাড়ে ছয় হাজার টাকা ছিল ভিকটিমের পকেটে, ওটা কেড়ে নিতে বুকের ঠিক মাঝখানে ছুরি বিঁধিয়ে দিল ছিনতাইকারী।

ওর লড়াই দেখে এগিয়ে এল আশেপাশের মানুষ, ধরা পড়ল তিন ক্রিমিনাল। কিন্তু হায়, ছেলেটা হারিয়ে গেল না ফেরার দেশের মেঘের আড়ালে!

ছেলেটার নাম পারভেজ হোসেন( 22) , পুলিশ কন্সটেবল, টুরিস্ট পুলিশ ইউনিট, কক্সবাজার।

এরকম শত শত কন্সটেবল পারভেজের রক্তে এই ভাঙাচোরা দেশের মানুষ রাতের বেলা শান্তিতে ঘুমায়, তারপর সকাল বেলা নিজের কুকাম ঢাকতে ট্রাফিক সার্জেন্টকে ঘুষ দেয়। দুপুরে ভাত খাবার আগে মাদারচোত পুলিশ বলে গালি দিতেও ভোলেনা আবার!

মিডিয়াতে এগুলো আসেনা বেশিরভাগ সময়ে, আসলেও কোন এক কোনাকাঞ্চি দিয়ে। “আসামীর কাছ থেকে পয়সা খেল পুলিশ” আপনি প্রতিদিন দেখবেন, “ছিনতাই ঠেকাতে জীবন দিল পুলিশ” কখনোই নয়। পুলিশের কল্লা নিতে তৈরি বাকি সব সংস্থা, জনগণ সবাই- কিন্তু পুলিশকে কিভাবে উন্নত করা যায় তা নিয়ে দু লাইন লেখবার সময় কই?!

সবুজ টি শার্টের উপর ছুরির আঘাতে বের হওয়া রক্ত যেন ঠিক বাংলাদেশের পতাকা। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন হবেনা ওর, কিন্তু বাংলা মায়ের পতাকা ওর বুকে জড়ানো ঠেকল কই!

পারভেজ, ভাই আমার! ভাল থাকিস তুই!

Written By

Mashroof Hossain

Senior ASP

Bangladesh Police

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *